জাপা’র রাজনীতিতে মসিউর রহমান রাঙ্গার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন: রংপুরে প্রতিহতের ডাক, উত্তপ্ত গঙ্গাচড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর তফসিল ঘোষণার পর গুমোট রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় পার্টির (জাপা) রাজনীতিতে হঠাৎ বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। দলের সাবেক মহাসচিব ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। জাপার কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তাকে বরণ করে নেওয়া হলেও নিজ নির্বাচনী এলাকা গঙ্গাচড়া এবং ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে রংপুরে প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।

ক্ষমা চেয়ে দলে প্রত্যাবর্তন

দলীয় সূত্র জানায়, গত ১৫ ডিসেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাঙ্গা। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে চেয়ারম্যানের কাছে ক্ষমা চেয়ে দলে ফেরার ঘোষণা দেন তিনি। গতকাল গুলশানে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় তাকে মঞ্চে শীর্ষ নেতাদের সারিতে দেখা গেলে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

এ প্রসঙ্গে মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, “আমি জাতীয় পার্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে এত দূর এসেছি। মাঝখানে রাজনীতির বাইরে ছিলাম, ভেবেছিলাম আর ফিরব না। কিন্তু দলের স্বার্থে আবারও ফিরেছি।”

নির্বাচনী এলাকায় বিরোধিতার মুখে রাঙ্গা

রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনে তিনবারের সাবেক এই সংসদ সদস্যের প্রত্যাবর্তনে গঙ্গাচড়া উপজেলা জাপার একটি বড় অংশ ক্ষুব্ধ। স্থানীয় নেতাদের দাবি, রাঙ্গা বা চেয়ারম্যানের ভাতিজা মকবুল শাহরিয়ার কেউই স্থানীয় নন। উপজেলা জাপার আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “গঙ্গাচড়ার মানুষ এবার স্থানীয় প্রার্থী চায়। বাইরের প্রার্থীর দালালি করলে মানুষ আমাদের দালাল মনে করে।” স্থানীয় কর্মীরা এবার লন্ডনপ্রবাসী মঞ্জুম আলীকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাইছেন।

তবে রাঙ্গা জানিয়েছেন, তিনি গঙ্গাচড়া থেকেই নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করছেন। বিরোধিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি মাঠে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

‘আওয়ামী লীগের দোসর’ তকমা ও ছাত্র আন্দোলন

এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর চারটি হত্যা মামলার আসামি রাঙ্গার রাজনীতিতে ফেরাকে ‘আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া’ হিসেবে দেখছেন ছাত্র নেতারা। জাতীয় ছাত্রশক্তির রংপুর মহানগর আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমদ বলেন, “রাঙ্গা ছিলেন শেখ হাসিনার মুখপাত্র। তাকে দলে ফিরিয়ে এনে জাপা প্রমাণ করল তারা আওয়ামী লীগের ‘বি টিম’। এই ব্যর্থতা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের।”

ছাত্রদের অভিযোগের জবাবে রাঙ্গা স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন, “আমরা আওয়ামী লীগের সাথে জোটে ছিলাম, মন্ত্রী হয়েছি। তাই তারা আমাকে ‘দোসর’ বললে সেটা অস্বাভাবিক নয়। যদি কোনো অন্যায় করে থাকি, তবে বিচারের মুখোমুখি হতে রাজি আছি।”

জাপার অবস্থান

রংপুর মহানগর জাপা সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির বলেন, “চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি রাঙ্গাকে দলে নিয়েছেন, তাই আমরাও তার পক্ষে থাকব।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাঙ্গার এই প্রত্যাবর্তন রংপুরের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে, তবে ছাত্র-জনতার ক্ষোভ প্রশমন করা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post