ঢাকা: ৩১ অক্টোবর, ২০২৫। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হলেও, এখন দেশের রাজনীতি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দেওয়ায় আসন্ন নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
প্রধান সমস্যা: 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য
গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল একটি 'জুলাই সনদ'-এর ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার করে দ্রুত একটি অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। কিন্তু ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
- বিএনপি'র অসন্তোষ: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন যে অন্তর্বর্তী সরকার ও ঐকমত্য কমিশন জনগণের সাথে 'বিশ্বাসঘাতকতা' করেছে। তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও, সংস্কারের চূড়ান্ত খসড়া মূল ঐকমত্য থেকে সরে এসেছে বলে অভিযোগ তাদের। বিএনপি নির্বাচনের আগে গণভোটের সুযোগ নেই বলেও পরিষ্কার জানিয়েছে, তবে তারা গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন একই দিনে চায়।
- সংস্কারপন্থী দলগুলোর আশঙ্কা: নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, উপদেষ্টারা দেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন এবং পরিস্থিতি জটিল করে নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা হতে পারে। গণসংহতি আন্দোলনও ঐকমত্য কমিশনের কিছু সুপারিশ নিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
- ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আলোচনা: অন্যদিকে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং এর ভূমিকা নিয়েও চলছে আলোচনা। বিভিন্ন দলের নেতারা বলছেন, বর্তমান ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সাথে প্রকৃত ইসলামী আদর্শের সম্পর্ক নেই, যা রাজনৈতিক বিতর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে নির্বাচন
রাজনীতির মূল ফোকাস এখন নির্বাচনের দিকে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিএনপি মাঠের রাজনীতিতে অনেকটাই একক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে মতানৈক্য এবং নতুন করে মেরুকরণের চেষ্টায় নির্বাচনের পরিবেশ কখন এবং কীভাবে তৈরি হবে, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সাংঘর্ষিক রাজনীতির পুরানো ধারায় ফিরে না গিয়ে, সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধভাবে সংস্কার ও নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়ার ওপর। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক পক্ষের মনোযোগও এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামনের চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি দ্রুত দলগুলোর সাথে আলোচনা করে 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়নের জটিলতা নিরসন করতে না পারে এবং নির্বাচনের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দিতে ব্যর্থ হয়, তবে দেশে আরও গভীর রাজনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে। এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে, জনগণ আশা করছে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেবে।
